ছাত্রসেনার ইতিহাস

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একাত্তরের পরাজিত ঘাতকচক্র তাদের ধার্মিকতার মুখোশের আড়ালে নবীদ্রোহি তৎপরতার মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে অগ্রসর হয়। এ লক্ষ্যে সেই নবীদ্রোহী চক্র চট্টগ্রাম সহ দেশের আনাচে কানাচে নানা উপায়ে সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষদের মাঝে পবিত্র কোরআন এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে প্রিয় হাবীবে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার শানে অবমাননা শুরু করে। তখনকার চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এর শীর্ষ স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও পীর মাশাইখ গণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিভিন্ন ছোট ছোট সংগঠনের নামে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন।

১৯৭৭ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামের ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসার প্রধান মোহাদ্দিছ আল্লামা শাহ আলাউদ্দিন (রঃ) তাঁর ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে “আঞ্জুমানে মুহিব্বানে রছুল (দঃ) ” নামে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে অবস্থানরত আওলাদ এ রাসূল (দরুদ) হযরত আল্লামা সৈয়দ আবিদ শাহ আল মাদানী (রঃ) “হিজবুর রসুল” নামে একটি যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

ঢাকায় আল্লামা খাজা আবু তাহের নকশেবন্দী (রঃ) “আনজুমানে আশেকানে মোস্তফা”-র ব্যানারে সুন্নী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে রত থাকেন। এভাবে সুন্নী ওলামায়ে কেরামগণ ও পীর মাশাইখ গণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে নাম জানা অজানা সংগঠন বা ওয়াজ মাহফিল করে সাধারণ সুন্নী জনতাকে সচেতন করতে ভূমিকা পালন করেন।

কিন্তু ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রসর ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রাম ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসার প্রধান মোহাদ্দিছ আল্লামা শাহ আলাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব। ১৯৭৮ সালের পহেলা মহররম তাঁর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদের সভাপতি চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রথিতযশা শিল্পপতি আলহাজ্ব ইসলাম মিয়া টি,কে সাহেবকে উন্মুক্ত মঞ্চে ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবহিত করেন ও এ সংগঠন-কে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে তাঁর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইসলাম মিয়া টি,কে সাহেব বিষয়টি জেনে আনন্দিত হন এবং অবারিত হস্তে একে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। এ ব্যাপারে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা সৈয়দ শামসুল হুদা (রঃ) ও একমত প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য পরবর্তীতে অধ্যক্ষ সৈয়দ শামসুল হুদা (রঃ) বিশাল ভূমিকা পালন করেন। মোহাদ্দিছ আলাউদ্দিন সাহেবের প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তোলাবায়ে আরাবীয়া নাম পরিবর্তন করে “জমিয়তে তোলাবায়ে আহলে সুন্নাত” নাম রাখা হয়। এ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অধ্যক্ষ সাহেব মাদ্রাসার দোতলায় অবস্থিত ৯ নং কক্ষ অনুমোদিত করেন। এখানে ধীরে ধীরে সুন্নী ছাত্ররা বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা উপলব্ধি করেন সংগঠনটি এই মাদ্রাসায় গন্ডিবদ্ধ না রেখে চট্টগ্রামের অন্যান্য সুন্নী মাদ্রাসায় ছড়িয়ে দিতে হবে। এরপর তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন অন্য মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সিনিয়র ওলামা মাশাইখ দের কাছে এ ব্যাপারে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন মাদ্রাসায় দাওয়াত নিয়ে গেলে কেউ কেউ একমত পোষণ করেন। আবার কেউ কেউ সংগঠন করতে দ্বিধা করেন। শুরুতে শীর্ষ স্থানীয় ওলামায়ে কেরামগণ দফায় দফায় বৈঠক করেন। এবার তাঁরা সম্মিলিত ভাবে বৈঠকে বসেন আহলা দরবার শরীফের হযরত আবুল মোকাররম নুরুল ইসলাম (রঃ)’র স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রাম কলেজের প্যারেড ময়দানের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে দেব পাহাড় এলাকার খানকায়ে নূরীয়াতে। ঐ সভার আহ্বায়ক ছিলেন মোহাদ্দিছ আল্লামা শাহ আলাউদ্দিন। আর সভাপতিত্ব করেন আহলা দরবার শরীফের তৎকালীন সাজ্জাদানশীন পীরে তরিকত হযরত সেহাব উদ্দীন খালেদ আল কাদেরী সাহেব। উপস্থিত ছিলেন আল্লামা নুরুল ইসলাম হাশেমী, আল্লামা মুফতী মোজাফফর আহমদ, আল্লামা জাফর আহমদ ছিদ্দিকী, আল্লামা জালাল উদ্দীন আল কাদেরী, মুফতি ওবায়দুল হক নঈমী প্রমুখ প্রথিতযশা সুন্নী ওলামায়ে কেরামগণ। সেই বৈঠকে নামকরণের প্রসঙ্গ আসলে দু একজন পূর্বের নাম বহাল রাখতে মতপ্রকাশ করেন। অধিকাংশ মত দেন যেহেতু এই সংগঠনটি শুধু মাদ্রাসার গন্ডিতে আবদ্ধ না রেখে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে, সেহেতু বাংলায় নাম রাখা উচিত। আল্লামা জাফর আহমদ ছিদ্দিকী প্রস্তাব করেন “শিবির” মানে তাঁবু দখল করতে হলে “ছাত্রসেনা” প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর উপস্থিত সবাই সাথে সাথেই তাঁর প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। এভাবে শুরু হয় ছাত্রসেনা’র যাত্রা।

একে একে সুন্নী দরবারের পীর-মাশাইখ,মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, মোহাদ্দিছ, ওস্তাদ ও মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন সহ আপামর সুন্নী জনতা ছাত্রসেনা’কে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
১৯৮০ সালের ২১ জানুয়ারি ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠা কালে ছাত্রসেনা অরাজনৈতিক ছিলো। সংগঠন রাজনৈতিক হবে নাকি অরাজনৈতিক থেকে যাবে এ নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিশাল মতদ্বৈততা ছিলো। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ঐতিহাসিকভাবে সুন্নী আলেম ও পীর মাশাইখ গণ সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের অনেকেই রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ এড়িয়ে চলতেন।

ইতিমধ্যে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছাত্রসেনা’ হযে দাঁড়ায় সন্ত্রাস মুক্ত এক আদর্শিক কাফেলার সার্থক প্রতিরুপ।

আশির দশকে ছাত্রসেনা আয়োজিত প্রথম সেমিনারে (ইমামে আযম আবু হানিফা শীর্ষক) প্রধান অতিথি ছিলেন ইমামে আহলে সুন্নত আল্লামা সৈয়দ আবু নছর আবিদ শাহ মোজাদ্দেদী আল মাদানী (রহঃ)।

১৯৮৪ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে আয়োজিত প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত হন যুগশ্রেষ্ঠ অলিয়ে কামেল আওলাদ এ রাসূল (দরুদ) হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রঃ)। এই মহান ওলী বজ্রনিনাদ কন্ঠে ঘোষণা করেন, “ইয়ে ছাত্রসেনা হামারা ঈমানী ফৌজ হ্যায়, ইয়ে আউলিয়া-এ-কেরাম কে ফৌজ হ্যায়। উনকা জরুর মদদ করনা।” অর্থাৎ “ছাত্রসেনা আমাদের ঈমান রক্ষার সেনা বাহিনী। এটা আউলিয়া-এ-কেরামের সেনাবাহিনী। একে সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য।” একথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি আয়োজকদের হাতে এক হাজার এক টাকা দান করে উৎসাহ দান করেন। আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রঃ) এর মতো একজন একাধারে আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও আওলাদ-এ-রাসূল (দরুদ) উন্মুক্ত সহযোগিতা ঘোষণা দেয়ায় সংগঠনে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়। নবীপ্রেমিক ছাত্র যুবকদের এই সংগঠনকে আপামর সুন্নী জনতা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

এদিকে আল্লামা সৈয়দ আবিদ শাহ আল মাদানী (রঃ)ও তাঁর সুযোগ্য সন্তান তৎকালীন সরকারী মাদ্রাসায়ে আলীয়া-ঢাকায় অধ্যয়নরত সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদীকে ছাত্রসেনা’র কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে কাজ করতে অনুমতি দিলে সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী ১৯৮৫ সালে ঢাকা আলীয়া মাদরাসায় ছাত্রসেনা’র প্রথম কমিটি গঠন করেন। ধাপে ধাপে কাজ করে দীর্ঘ নয় বছর ধরে কেন্দ্রীয় পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৮ সালে ছাত্রসেনা’র ব্যানারে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড ময়দানে আয়োজন করা হয় শতাব্দীর বৃহত্তম ছাত্র সমাবেশ। বিশাল সেই ছাত্র সমাবেশে অর্থ যোগান দিয়ে উপস্থিত সকলকে একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফের গদীনশীন পীর হযরত সৈয়দ মঈনউদ্দীন আল হাসানী। এর মাধ্যমে সৈয়দ মঈনউদ্দীন আল হাছানী মাইজভান্ডারী ছাত্রসেনা’র নেতা কর্মীদের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সিক্ত হন। এই বিশাল ছাত্র সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সেসময়কার প্রভাবশালী দেশ ইরাকের রাষ্ট্রদূত জোহাইর মুহাম্মদ ওয়াম ও মুক্তিকামী ফিলিস্তিন এর রাষ্ট্রদূত শাহতা জারব। ছাত্রসেনা’র দাওয়াত পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। বিশাল ওই ছাত্রসমাবেশ এর উপর নিউজ কাভার করে বিদেশি ম্যাগাজিন “Far Eastern Economic Review।

এসব কিছু দেখে একাত্তরের ঘাতক দালালদের মাথা ঘুরে যায়। তারা টার্গেট করে ছাত্রসেনা’কে দমন করা না গেলে এটিই একসময় রাজাকারের প্রেতাত্মা শিবিরের রাজনীতি ধ্বংস করতে যথেষ্ট বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই তারা ১৯৮৪ সালের ১০ জুলাই হত্যা করে চন্দ্রঘোনা তৈয়বীয়া মাদ্রাসার কিশোর শিক্ষার্থী ও ছাত্রসেনা কর্মী আবদুল হালিমকে। ১৯৮৬ সালের ১০ এপ্রিল চট্টগ্রাম সরকারী কমার্স কলেজ চত্বরে ছাত্রসেনা’র নবীন বরণ অনুষ্ঠানে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করা হয় কুয়াইশ বুড়িশ্চর ডিগ্রি কলেজ এর ছাত্র ও ছাত্রসেনা’র চান্দগাঁও থানা শাখার দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ লিয়াকত আলীকে। এরমধ্যে বারই রবিউল আওয়ালের জশনে জুলুছে ঈদে মিলাদুন্নবী (দরুদ)- তে যোগদানের পথে হাটহাজারি এলাকায় জামাতী ওহাবি চক্র একজোট হয়ে সুন্নীদের কাফেলায় হামলা করে। নির্মমভাবে শাহাদাতের সুরা পান করেন সুন্নী কর্মী রফিক।

ছাত্র সেনা’র ব্যানারে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সকল অনুষ্ঠানে যে ব্যক্তি সর্বাগ্রে ছুটে এসে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন তিনি ছিলেন আশেকে রাসুল আল্লামা খাজা আবু তাহের নকশেবন্দী (রহঃ)। সে সময় তিনি তাঁর শহীদবাগস্থিত বাসায় ছাত্রসেনা’র নেতা কর্মীদের জন্য রীতিমত লঙ্গরখানা খুলে আপ্যায়ন করাতেন। আর এর নেপথ্যে কষ্ট স্বীকার করতেন তাঁর মহীয়সী স্ত্রী। তাই ছাত্রসেনা’র সোনালী ইতিহাসে এই মায়ের অবদানও অনস্বীকার্য।

ছাত্রসেনা’র উদ্যোগে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যিনি সম্পূর্ণ রেলের ভাড়া পরিশোধ করেন তিনি হলেন চট্টগ্রামের “বাহির সিগনাল আল আমিন বারীয়া দরবার শরীফ”- এর প্রতিষ্ঠাতা হযরত হাফেজ আবদুল বারী শাহজী (রহঃ)।

 

………………………….

বিস্তারিত ইতিহাস শীঘ্রই ওয়েবসাইটে সংযোজিত হবে।

সুন্নীয়তের রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের ধারায় সেনা-ফ্রন্টের তিন যুগ'

ছাত্রসেনার  ইতিহাস জানতে পড়ুন অধ্যক্ষ ইব্রাহিম আক্তারী লিখিত সুদীর্ঘ  ইতিহাসগ্রন্থ ‘সুন্নীয়তের রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের ধারায় সেনা-ফ্রন্টের তিন যুগ’। বইটি শীঘ্রই ই-বুক আকারে এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে।