খবরের বিস্তারিত...


স্বাধীনতা সংগ্রামী হযরত মাওলানা শাহ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) এর জীবনী (ফুরফুরা দরবার শরীফ)

মাওলানা শাহ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) হুগলী জেলার ফুরফুরায় জন্মগ্রহণ করেন। [জন্ম সন সম্বন্ধে মতভেদ আছেঃ সন ১২৫৩, বাংলা সংসদ, বাঙালী চরিতাভিধান, প্রধান সম্পাদক, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৭৬ খৃঃ, পৃঃ ৪৩; সন ১২৬৫ বাংলা, এম ওবাইদুল হক, বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণ ফেনী, ১৯৬৯ খৃঃ, পৃঃ ৩৫; সন ১২৬৩ হিঃ, মুহাম্মদ মুতীউর রহমান, আঈনা-ই-ওয়ায়সী, পাটনা, ১৯৭৬ খৃঃ, পৃঃ ২৪২; দেওয়ান মুহাম্মদ ইব্রাহীম তর্কবাগীশ, হাকীকতে ইনসানিয়াত, রাজশাহী, ১৩৯০, হিঃ, পৃঃ ৩]। তিনি প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকী (রা.)-এর বংশধর। তাঁর এক পূর্ব পুরুষ মানসুর বাগদাদী ৭৪১/১৩৪০ সালে বঙ্গদেশে আসেন এবং হুগলী জেলার মোল্লাপাড়া গ্রামে বাস করেন (ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, ঢাকা, ১৯৬৩ খৃঃ, পৃঃ ১১৭-২৬)। মানসুর বাগদাদীর অধস্তন অষ্টম পুরুষ মুস্তফা মাদানী ছিলেন শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.), (মৃঃ ১০৩৪/১৬২৪)-এর তৃতীয় পুত্র মাসুম রাব্বানীর মুরিদা কথিত আছে, মাসুম রাব্বানীর অন্যতম মুরিদ ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব (মৃঃ ১১১৮/১৭০৭)। তিনি মুস্তফা মাদানীকে মেদিনীপুর শহরে একটি মসজিদ সংলগ্ন মহল ও বহু লা-খারাজ (নিস্কর) সম্পত্তি দান করেছিলেন (ইসলাম প্রসঙ্গ)।
হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকীর বয়স যখন মাত্র নয় মাস, তখন তাঁর পিতা আবদুল মুক্তাদীর (রহ.) এন্তেকাল করেন (১২৬৬ ব.)। তাঁর মাতা মাহাব্বাতুন নিসার আগ্রহে ও যত্নে তিনি প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। সিতাপুর মাদ্রাসা ও পরে হুগলী মুহসিনিয়া মাদ্রাসায় তিনি অধ্যয়ন করেন। শেষোক্ত মাদ্রাসা হতে তিনি কৃতিত্বের সাথে জামাআতে উলা (ফাজিল) পাশ করেন। অতঃপর তিনি কলকাতা সিন্ধরিয়া পট্টির মসজিদে হাফিজ জামালুদ্দীন-এর নিকট তাফসীর হাদীস ও ফিকহ অধ্যয়ন করেন। হাফিজ সাহেব শহীদ সায়্যিদ আহমাদ বেরেলবী (রহ.) (মৃঃ ১২৪৬/১৮৩১)-এর খলিফা ছিলেন। কলকাতা নাখোদা মসজিদে মাওলানা বিলায়াত (রহ.)এর নিকট তিনি মানতিক, হিকমা (গ্রীক বিজ্ঞান) ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ২৩/২৪ বৎসর বয়সে তিনি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। অতঃপর তিনি মদীনা শরীফ গমন করেন। তথায় হাদীস অধ্যয়ন করেন এবং রওজা মুবারক-এর খাদেম বিখ্যাত আলেম আদ-দালাইল আমীন রিদওয়ান-এর নিকট হতে ৪০টি হাদীস গ্রন্থের সনদ লাভ করেন। (হাকীকতে ইনসানিয়াত পৃঃ ৪; বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণ পৃঃ ৩৬; আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, ফুরফুরার পীর হযরত আবু বকর সিদ্দিকী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৮০, পৃঃ ১০-১১) তৎপর দেশে প্রত্যাবর্তন করে একাধিক্রমে ১৮ বছর তিনি ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন ও গবেষনা করেন। (ফুরফুরার পীর হযরত আবু বকর সিদ্দিকী পৃঃ ১১)
পাঠ্যাবস্থাতেই ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। রাত জেগে তিনি জিকির করতেন। শরিয়তের হুকুম-আহকাম সাধ্যমত পালন করতে তিনি অতিশয় যত্নবান ছিলেন। এভাবে যখন তিনি নিরলস সাধনায় রত ছিলেন, তখন কলকাতায় বিখ্যাত ওলী শাহ সুফি ফতেহ আলী (রহ.) (মৃঃ ১৩০৪/১৮৮৬)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) তাঁর নিকট বায়আত গ্রহণ করেন এবং নিষ্ঠার সাথে ইলম-ই-মারিফত শিক্ষা করেন। তিনি সুফি ফতেহ (রহ.)-এর একজন প্রধান খলিফা ছিলেন। ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। বিভিন্ন ফিকহী মাসআলার সঠিক উত্তর জিজ্ঞেস করা মাত্রই তিনি কেতাব না দেখে বলে দিতেন। কথিত আছে, স্বপ্নে তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কিছু দীনি মাসআলা শিক্ষা করেছিলেন (বাংলাদেশের পীর-আউলিয়াগণ, পৃঃ ৩৭)। তিনি দুবার (১৩২১ ও ১৩৩০ র.) হ্জ আদায় করেন। শেষবারের হজ্জে তাঁর সাথে প্রায় ১৩০০ জন মুরিদও ছিলেন (পূঃ গ্রঃ পৃঃ ৩৮)। তৎকালে বঙ্গদেশের হজ্জ যাত্রীদেরকে বোম্বাই যেয়ে জাহাজে আরোহণ করতে হত। ফলে তাঁরা বিশেষ দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতেন। তাঁরই চেষ্টায় বাঙ্গালী হাজিদের জন্যে কলকাতা হতেই জাহাজের ব্যবস্থা করা হয়। (ফুরফুরার পীর হযরত আবু বকর সিদ্দিকী পৃঃ ৩৬-৩৭)।
তিনি একজন কামেল পীর ছিলেন। বঙ্গদেশের প্রতি এলাকায় এবং বাইরেও তাঁর অনেক মুরিদ রয়েছেন। তাঁর মতে শরিয়ত ব্যতীত মারেফাত হয় না। ইবাদত-বন্দেগীতে, কাজ-কর্মে, চাল-চলনে, আচার-অনুষ্ঠানে, রীতি-নীতিতে, মোটকথা সকল ব্যাপারে যিনি শরিয়তের অনুবর্তী হন তিনিই পীর হতে পারেন। তিনি বলতেন, কেবল পীরের বংশেই যে পীরের জন্ম হবে এমন কথা কেতাবে নেই। যে বংশেরই হউক না কেন, যিনি শরিয়ত ও মারেফাত ইত্যাদিতে কামেল হবেন, তিনিই পীর হতে পারবেন। (রুহুল আমীন, হযরত পীর সাহেব কেবলাহর বিস্তারিত জীবনী পৃঃ ২৪৬-৪৭; হাকীকতে ইনসানিয়াত, পৃঃ ৯৮-৯৯)।
তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা। বাংলা ও আসামের শহরে ও গ্রামে তিনি বহু ধর্মসভায় ওয়াজ-নছিহত করেছেন, বিদআতপন্থী ও বে-শরআ পীর-ফকীরদের বিরুদ্ধে তিনি মৌখিক প্রচার ও লেখনীর মাধ্যমে বিরামহীন সংগ্রাম করেছেন। তৎকালে আলেমরা সাধারণত বাংলা শিখতেন না এবং বাংলা ভাষায় কিছু লিখতে আগ্রহী ছিলেন না। সহজ সরল বাংলা ভাষায় সাধারণের বোধগম্য করে শরিয়তের বিধি-বিধান তথা ইসলামী বিষয়াদির ওপর বই-পুস্তক রচনা করতে তিনি তাঁর আলেম ও ইংরেজী শিক্ষিত মুরীদেরকে উৎসাহিত করেন। ফলে রুহুল আমীন (মৃঃ ১৯৪৫), মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আবদুল হাকীম (বিখ্যাত তাফসীরকারক), ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ আরও অনেকে এ কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর অনুমোদনক্রমে অথবা তাঁর নির্দেশে লিখিত এ ধরণের কেতাব-পুস্তকের সংখ্যা হাজারের অধিক হবে। মাওলানা রুহুল আমীন একাই প্রায় ১৩৫ খানা পুস্তকের রচয়িতা। তাঁর নির্দেশে লিখিত বা অনুমোদন প্রাপ্ত কয়েকখানা বইয়ের নাম উল্লেখ করা যায়। যথাঃ আক্কায়েদে ইসলাম, তাসাওউফ, ছিরাজুস ছালেকীন, পীর-মুরিদতত্ত্ব, বাতেল দলের মতামত, নছীহতে সিদ্দিকীয়া, ফাতওয়ায়ে সিদ্দিকীয়া, তালিমে তরীকত, এরশাদে সিদ্দিকীয়া ইত্যাদি। তরীকত দর্পণ বা তাছাওউফ তত্ত্ব বইটি আবু বকর সিদ্দিকীর মুখ নিঃসৃত বাণীর সংগ্রহ (হাকীকতে ইনসানিয়াত, ৯৬-৯৭)। তিনি নিজেও একজন সুলেখক ছিলেন। পত্র-পত্রিকায় তাঁর বহু বিবৃতি, কিছু প্রবন্ধ ও লিখিত ভাষণ প্রকাশিত হয়েছে। (শরিয়তে এসলাম, আল-এসলাম ও ছুন্নত আল-জামাত পত্রিকার পুরাতন সংখ্যাগুলো)। তাঁর রচিত তারিখুল ইসলাম (বাংলা), কাওলুল হাক (উর্দু) এবং অছীয়তনামা (বাংলা) প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আদিল্লাতুল-মুহাম্মাদিয়া নামে আরবিতে একটি কেতাবও রচনা করেছেন, কিন্তু উহা প্রকাশিত হয়নি (দ্রঃ ফুরফুরা শরীফের হযরত পীর সাহেব (রহ.)-এর মত ও পথ, পাবনা হতে রমজান আলী কর্তৃক প্রকাশিত, পৃঃ ৬, বাংলাদেশের পীর-আউলিয়াগণ, পৃঃ ৪১-৫১)।
মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্যে তিনি যথেস্ট চেষ্টা করেন। মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকার সংস্কারের জন্যে তিনি দাবি জানান। যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে তিনি মুসলমানদেরকে উপদেশ দেন, বিশেষত ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের প্রতি তিনি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বালক-বালিকাদেরকে ইবতেদায়ী তালীম (প্রাথমিক শিক্ষা)। ইসলামী তরীকা অনুযায়ী ও ইসলামী পরিবেশে দেয়ার জন্যে তিনি জোর তাকীদ করেন। তাঁর মতে নারী-শিক্ষাও জরুরি, তবে পর্দার সাথে। তাদের জন্যে, বিশেষতঃ উচ্চশ্রেণীর বেলায় পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তিনি উপদেশ দেন (হাকীকাতে ইনসানিয়াত পৃঃ ৬৬-৭৪, ১৪০; শরিয়তে এসলাম পত্রিকা, ৩য় বর্ষ, ১০ সংখ্যায়)। তাঁর চেষ্টায় বঙ্গদেশের নানা স্থানে প্রায় ৮০০ মাদ্রাসা ও ১১০০ মসজিদ স্থাপিত হয়েছিল। তাঁর নিজ গ্রামে তিনি একটি  ওল্ড স্কীম  ও একটি  নিউ স্কীম মাদ্রাসা এবং একটি ভাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (পৃঃ গ্রঃ পৃঃ ৬৫-৬৬)। ১৯২৮ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম গভর্নিং বডী গঠিত হয়। তিনি উহার সদস্য ছিলেন (আবদুস সাত্তার, তারিখ ই-মাদ্রাসা ই-আলিয়া, ঢাকা, ১৯৫৯, পৃঃ ৮৪-৮৫)।
সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবু বকর সিদ্দিকীর অবদান রয়েছে। তিনি মুসলিম সমাজ হতে শিরক, বিদআত ও অনৈসলামী কাজকর্ম দূর করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেন। তাঁর পরামর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৩১৭/১৯১১ সনে আঞ্জুমানে ওয়ায়েজীন নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। (আনিসুজ্জামান, মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্রিকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৬৯, পৃঃ ১২৫)। এর উদ্দেশ্যাবলীর মধ্যে ছিল মুসলিমদেরকে হেদায়েত করার জন্যে ওয়াজ নছীহাত-এর ব্যবস্থা করা, খৃষ্টান মিশনারীদের কার্যকলাপের প্রতিবিধান করা ও অমুসলিমদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করা। এ আঞ্জুমানের প্রচেষ্টার বেশ কিছু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন (৯ ইসলাম দর্শন, ১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ, ১৩২৭; মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র, পৃঃ ৩২৫)। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ আঞ্জুমানের সভাপতি ছিলেন।
জামাইয়াত-ই ওলামা-ই-হিন্দ ১৯১৯ ইংরেজী সনে প্রতিষ্ঠিত হয়। উহার একটি শাখা জামইয়াত ই-ওলামা ই-বাংলা (ও আসাম)। মাওলানা সিদ্দিকী শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন এবং আযাদী আন্দোলনে অংশ্রগহণ করেছিলেন। এর এক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতে পূর্ণরূপে আমল করে দেশ ও কওমের খেদমতের জন্যে আলেমদেরকে রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতিতে যোগ দেয়া আবশ্যক। (শরিয়তে ইসলাম, ১০ বর্ষ ৮ম সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৪২)। তিনি আরো বলেছিলেন, রাজনীতি ক্ষেত্র হতে আলেমদেরকে সরে পরার জন্যে আজ মুসলিম সমাজে নানাবিধ অন্যায় ও বেশরা কাজ হচ্ছে (পৃঃ সা.)।
কলকাতায় ১৯২৬ সালে জামইয়াত-ই-ওলামা-ই-হিন্দের বার্ষিক সভায় অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হলে তিনি উহার বিরোধিতা করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন-আইন অমান্য আন্দোলনের ফলে শান্তি-শৃংখলা বিনষ্ট ও মহা ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। স্বরাজ স্বাধীনতা সকলের কাম্য,উহা লাভ করার জন্যে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করা অবশ্য প্রয়োজন, নতুবা তার ফল হবে ভয়ংকর বিষময়। ভারতের মুসলমানরা এ বিষয়ে বহু পশ্চাতে পড়ে আছে। তারা সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষায় নিতান্ত পশ্চাৎপদ; সুতরাং তাদেরকে শিক্ষা, সংগঠন প্রভৃতি বিষয়ে উন্নত করতে হবে, নতুবা মহাসর্বনাশ অনিবার্য। আইন অমান্য আন্দোলন হতে সম্পুর্ণ পৃথক থাকা বিশেষ প্রয়োজন। (শরিয়তে ইসলাম, ৫ম বর্ষ, আষাঢ় সংখ্যা, পৃঃ ১৪২-৪২)। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দের প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি তার মুরিদান, মুতাকিদীন ও সাধারণ মুসলিমদেরকে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ড কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে অনুরোধ করেছিলেন (ছুন্নত-অল-জামাত পত্রিকা, ৪র্থ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ৫৬, হাকীকতে ইনসানিয়াত পৃঃ ২৪৬)।
জমিয়তের সভাপতি হিসেবে তিনি সৌদী আরবের সুলতান আবদুল আজীজ ইবনে সৌদকে শরিয়ত বিরোধী কার্যাদি রোধ সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করে ১৩৫১ হিজরীতে পত্র লিখেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আরো চেষ্টা করা হবে বলে বাদশাহ তাঁর পত্রের জবাব দিয়েছিলেন (হাকীকতে ইনসানিয়াত, পৃঃ ১১৫-১৭)।
তৎকালীন সমাজে সংবাদপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তিনি এ কথাটি ভালভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আর্থিক সংকটে পতিত হয়েছে, এমন অনেক পত্রিকাকে তিনি নিজ তহবিল হতে অথবা চাঁদা সংগ্রহ করে সাহায্য করেছেন (হাকীকতে ইনসানিয়াত, ২৯)। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় যে সকল পত্র-পত্রিকা পকাশিত হয়েছিল উহার কয়েকটির নাম উল্লেখ কর হলঃ (১) মিহির ও সুধাকর (সাপ্তাহিক), সম্পাদক, শেখ আবদুর রহিম, ১ম প্রকাশ, ১৮৯৫; (২) নবনূর (মাসিক), সম্পাদক, সৈয়দ এমদাদ আলী, ১ম প্রকাশ, ১৯০৩, (৩) মোহাম্মদী (সাপ্তাহিক), সম্পাদক মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, ১ম প্রকাশ ১৯০৮, (৪) সুলতান (সাপ্তাহিক), পরবর্তীকালে দৈনিক, সম্পাদক, প্রথমে রেয়াজুদ্দিন আহমদ ও পরে মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ১ম প্রকাশ, ১৯০২; (৫) মুসলিম হিতৈষী (সাপ্তাহিক), সম্পাদক শেখ আবদুর রহিম, ১ম প্রকাশ ১৯১১; (৬) ইসলাম দর্শন (মাসিক), আঞ্জুমানে ওয়ায়েজীনের মুখপত্র, সম্পাদক, মোঃ আবদুল হাকিম ও নূর আহম্মদ, ১ম প্রকাশ, ১৯২০, (৭) হানাফী (সাপ্তাহিক), সম্পাদক, মোহাম্মদ রুহুল আমীন, ১ম প্রকাশ, ১৯২৬; (৮) শরিয়তে এসলাম (মাসিক), সম্পাদক, আহমদ আলী এনায়েতপুরী, ১ম প্রকাশ, ১৯২৬।
তাঁর খলিফাদের সংখ্যাও অনেক। তারা তাঁর অনুসরণে কাজ করে গিয়েছেন। ফলে তাঁর এন্তেকালের পরও তাঁর আরদ্ধ কাজে ছেদ পড়েনি। তাঁর পাঁচ পুত্র। প্রথম পুত্র শাহ সুফী আবু নসর মুহাম্মদ আবদুল হাই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। পুত্ররা সকলেই ইলম-ই-শরিয়াতে জ্ঞান সম্পন্ন এবং তাঁর খলিফা ছিলেন।
তিনি ১৯৩৪ খৃঃ হতে বহুমূত্র রোগে ভুগছিলেন। ১৯৩৮ খৃঃ তাঁর আরো কিছু রোগ দেখা দেয়। ফলে তিনি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন তিনি চিকিৎসার জন্যে কলকাতা গমন করেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। ঐ বৎসরে ডিসেম্বর মাসে তিনি ফুরফুরায় ফিরে যান। ১৯৩৯ খৃঃ মার্চ মাসের ৫, ৬ ও ৭ তারিখে ইসাল-ই-ছওয়াব অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ভক্তের সাথে তিনি নিয়মাফিক দেখা-সাক্ষাৎ করেন ও তাঁদেরকে যথারীতি তালিমদেন। তিনি মাহফিলের আখেরী মুনাজাতও পরিচালনা করেন। ২৫ মুহাররাম, ১৩৫৮ হিঃ/ ৩ চৈত্র, ১৩৪৫ বঃ/১৭ মার্চ, ১৯৩৯ খৃঃ শুক্রবার প্রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফুরফুরার মিয়াপাড়া মহল্লায় তাঁকে দাফন করা হয়। এখনো প্রতি বৎসর ফাল্গুনের ২১, ২২ ও ২৩ তারিখে সেখানে ইসাল ই-ছাওয়াব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
শাহ আবু বকর সিদ্দিকী সে যুগের একজন শ্রেষ্ঠ হাদী ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে সে যুগের অন্যতম মুজাদ্দিদ বলেও আখ্যাযিত করেছেন। (হাকীকতে ইনসানিয়াত, পৃঃ ১২৫)। তাঁর কিছু কারামাতেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। (পূঃ গ্রঃ পৃঃ ১৮৫-১৯১)।
তাকওয়া পরহেযগারী আমল আখলাক
হযরত মাওলানা সুফী আবদুল মাবুদ (রহ.) সওয়ানেহে ওমরী পুস্তকে লেখেন যে একদিন মোজাদ্দেদে জামান পীর সাহেব ১১ নং নিউ মার্কেটের মসজিদের দোতলায় তশরীফ রাখেন। আমি (সুফি আব্দুল মাবুদ) তথায় ছিলাম। মুনশী আবদুল বারি নামে জনৈক ব্যক্তি হুয়ুরের কাছে বায়য়াত করে কাদিরীয়া তরীকা লাভের আগ্রহ প্রকাশ করলে হুযুর আমাকে উক্ত তরীকার দরূদ শরীফ লিখে দিতে আদেশ করেন। আমি সে মত তাঁর বিছানায় পাওয়া এক টুকরা কাগজে দরূদ শরীফ লিখে দিই। মুনশী সাহেব দরূদ শরীফ লিখা কাগজটি হুজুরকে দেখালে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কাগজ কোথায় পেলে? আমি বললাম- হুযুরের বিছানায় ছিল। তিনি বললেন কাগজ কার জানো? আমি বললাম, জী না। হুযুর বলেন  অজানা দ্রব্য ব্যবহার করা কি জায়েয আছে? তৎশ্রবণে আমি খুবই লজ্জিত হলাম। হুযুর বললেন-একটি ছেলে তাবিজ লেখার জন্য কাগজ এনেছিল, সে নিচে আছে। যাও তার কাছে মাফ চেয়ে এসো। আমি তৎক্ষণাৎ নিচে যেয়ে তার কাছে মাফ চাইলাম এবং দরকার পড়তে পারে চিন্তা করে তার দোয়াত-কলম ব্যবহার করার অনুমতি গ্রহণ করলাম। অতঃপর একটি ফতওয়ায় হুযুরের দস্তখতের দরকার পড়ায় উক্ত দোয়াত-কলাম হাযির করলে, তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ এ কার দোয়াত-কলম? তার থেকে ইজাজত নিয়েছো কি? আমি বললামঃ হুযুরের কথা উল্লেখ করি নাই, তবে আমার জন্য অনুমতি নিয়েছি। হুযুর বললেন তোমার জন্য উহা জায়েয কিন্তু আমার জন্য নয়।
উক্ত সুফি সাহেব আরও বলেন, একদিন হুযুর আমাকে বলেন দেখতো বাবা এ আয়াত কোন সূরায়? আমি সূরা বার করার জন্য যেই কুরআন শরীফ হাতে নিয়েছি অমনি হুযুর জিজ্ঞাসা করলেনঃ এ কুরআন শরীফ কার? আর যায় হোক ইজাজত লওয়া হয়েছে কি? আমরা শুনে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম। পুনঃ তিনি বলেনঃ এসব বিষয়ে খেয়াল রাখা আবশ্যক, তা না হলে কখনই তরক্কি করতে পারবে না।
নদীয়া কপুরহাটের মাওলানা ফজলুল রহমান সাহেব বর্ণনা করেন : 
মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) গোয়ালন্দে তাসরিফ আনলে সেখানে রেলওয়ে কোম্পানীর পাথুরিয়া কয়লা দ্বারা তাঁর খানা পাকানো হল। একথা জানতে পেরে তিনি বললেন,রেলওয়ে কোম্পানী তো অন্য লোকের খানা পাক করার জন্যে কয়লা ব্যবহার করার অনুমতি দেয়নি। সুতরাং এ কয়লা দিয়ে পাক করা খানা খাওয়া আমার জন্যে জায়েজ হবে না। পরে বাজার হতে কাঠ কিনে এনে তাঁর জন্যে আবার খানা পাকানো হল।
চট্টগ্রামের মৌলভী আবদুল মজিদ সাহেবের দাওয়াতে মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) একবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। সেখানে একদিন ফজরের ওয়াক্তে মাদ্রাসার ছাত্ররা বোর্ডিং হতে পানি গরম করে ওযুর জন্যে হুজুরের কাছে উপস্থিত করলো। হুজুর জিজ্ঞেস করলেন,-এ পানি কোত্থেকে গরম করা হয়েছে? ছাত্ররা উত্তরে বললো, বোর্ডিং-এ গরম করা হয়েছে। হুজুর তখন বললেন, যিনি বোর্ডিং-এ কাঠ দান করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আমার এ ওযুর পানি গরম করার জন্যে দেন নি। এ কথা বলেই তিনি নিজের পকেট থেকে কাঠের মূল্য আদায় করে দিলেন।
জয়পুরহাটের মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব বর্ণনা করেন : 
একদিনের ঘটনা। আজ্ঞুমানে ওয়ায়েজীনের অফিসে মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) তাসরিফ আনলেন। বিশেষ প্রয়োজনে হুজুরের কাছ থেকে এক ব্যক্তি একটি দস্তখত নিল। দস্তখত করেই হুজুর জিজ্ঞেস করলেন, এ দোয়াত কলম কোথাকার? আমি বললাম, এটা আঞ্জুমান অফিসের দোয়াত-কলম। হুজুর বললেন, এ দোয়াত-কলম অফিসের কাজ করার জন্যে, আমার দস্তখত করার জন্য নয়। অতঃপর হুজুর উহার মূল্য বাবদ দুআনা পয়সা দিয়ে দিলেন।
মোজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর এক মুরিদ একটি নালাতে কয়েকটি মাছ দেখতে পেয়ে মাছগুলো দিয়ে বদনাটি পূর্ণ করে তাঁর কাছে নিয়ে আসলো। হুজুর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ মাছগুলো কোত্থেকে আনলে? সে ব্যক্তি বললো একটি নালা দিয়ে মাছগুলো যাচ্ছিল, সেগুলোই আমি ধরে এনেছি।
হুজুর ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, উক্ত নালা এবং যে পুকুর হতে মাছগুলো বের হয়েছে, সেগুলো কার অধিকারভুক্ত তা তুমি জান কি? সে ব্যক্তি বললো না। হুজুর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কয় বছর হল তুমি আমার কাছে মুরিদ হয়েছো ? লোকটি বললো, নয় বছর।
হুজুর বললেন, এ নয় বছরে কিছু শিক্ষা পেয়েছ কি? সে ব্যক্তি বললো,-কলবের ছবক মশ্ক করছি; কিন্তু কোন ফায়েজ বুঝতে পারছি না। হুজুর পরিশেষে তাকে বললেন,-অন্তর শুদ্ধির পরিপন্থী এরূপ অযোগ্য রীতি-নীতিতে কি ফায়েজ জারি হতে পারে? যাও মাছগুলো স্বস্থানে রেখে এসো। যদি কোনটি মরে গিয়ে থাকে, তবে মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে এসো। যদি সে মাফ না করে তবে মূল্য দিয়ে দেবে।
দীনি শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় একটি মাত্র ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায়। তদীয় খলিফা মাওলানা আবদুল মাবুদ মেদেনীপুরী একদিন শিয়াখালা যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন-হুজুরের কামরায় প্রচন্ড মশা, অথচ আপনার কামরায় মশারী নেই। তাই হুজুরের জন্য একটা মশারী কিনে আনতে চাই। মোজাদ্দেদে জামান জিজ্ঞাসা করেন-মশারী কত নেবে গা ?  তিনি বলেন হুযুর! ৩/৪ টাকায় হবে। হুযুর ইরশাদ করেন। ঐ টাকা মাদ্রাসার তালেবে ইলমদের জন্য মাদ্রাসার ফান্ডে জমা দাও। আবূ বকরকে মশায় খাক, এর অসিলা যেন নাযাতের কারণ হয়।
হযরত মাওলানা পীরযাদা বাকীবিল্লাহ সিদ্দিকী সাহেব বলেন: একদিন আমার দাদাজী আমাকে (তাঁর মাখানো ভাত খাওয়ানোর সময়) বলেন ঃ তুমি কার পোতা বলে পরিচয় দেবে? আমি বললাম ঃ আমি ফুরফুরার পীর সাহেবের পোতা। দাদাজী বলেন না, তা বলবে না। আমি যখন হুগলী মাদ্রাসায় পড়তাম, তখন প্রয়োজনের তাগিদে বেশ কিছু দিন রান্নার কাজে রাঁধুনিকে সাহায্য করতে হত, এমন কি নিজ হাতে বাটনা বাটতে হয়েছিল, কাজেই রাঁধুনির পোতা বলে আত্মপরিচয় দিবে। একদিকে নিজের হাস্তিকে নিস্ত করলেন, অন্যদিকে বিদ্যাশিক্ষার্থীদের তিনি উত্তম সবক দিলেন।
আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.) লেখেন ঃ খুলনা জেলার  সাতক্ষীরার একটি মেথরের মেয়ে মুসলমান হয়ে দশ পারা কুরআনের হাফিজ হয়। তথাকার নামযাদা তছিরুদ্দীন সরদার তাকে নিকাহ করেন। ফলে লোকেরা তাকে সমাজচ্যুত করে, জন-মজুরী সব বয়কট করে। আমি ও যশোহর-বাঁকড়ার মরহুম মাওলানা সানাউল্লাহ সাহেব তথায় উপস্থিত হয়ে সমাজকে বোঝাতে থাকি, কিন্তু তারা আমাদের কথা অমান্য করে বয়কট বহাল রাখে। বেচারা তছিরুদ্দীন সাহেব কয়েক বছরের মধ্যে একেবারে অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে। শেষে নও মুসলিম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ফুরফরায় হযরত পীর মুজাদ্দিদে-যামান (রহ.)-এর বাড়িতে উপস্থিত হন। তাঁর নিদারুণ দুঃখের কাহিনী শুনে, পীর সাহেব বলেন, সাতক্ষীরার লোকেরা এতবড় জাহিল হয়ে আছে, তা আমি জানতাম না!
অতঃপর তিনি উক্ত স্ত্রীলোকটিকে বাড়ির মধ্যে যাওয়ার আদেশ করেন। হযরত মোজাদ্দেদে জামান পীর সাহেব বাড়ির মধ্যে যেয়ে বড় পীর আম্মাকে বলেন ঃ দু খানা বাসনে ভাত-তরকারী দিয়ে একখানা সেই সাতক্ষীরার মেয়েকে, অপর বাসনটি বাহিরে তছিরুদ্দীন সরদারকে দেওয়া হোক। পীর আম্মাকে আরও বলেন-যদি আপনার দাদা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শাফায়াত চান, তবে ঐ মেয়েটির ঝুটা ভাত-তরকারী আহার করুন। আর আমি বাহিরে তছিরুদ্দীন সরদারে ঝুঁটা খাইব। আল্লাহ্ যদি আবূ বকরের আর কোন বন্দেগী কবুল না করেন, তবে আশা করি এ আমলের জন্য বেহেশতে দাখিল হইতে পারিব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-র শাফায়াত হইতে বঞ্চিত হইব না। পীর আম্মা তাঁর হুকুম তামিল করেন। সাতক্ষীরাবাসীরা হযরত মুজাদ্দিদে যামানের হৃদয়বিদারক কথা শুনে অনুতপ্ত হয়ে তাকে সমাজে গ্রহণ করে। তিনি এমন কত অসংখ্য পতিত ব্যক্তিকে সমাজভুক্ত করে দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা করা যায় না।
আল্লামা বজলুর রহমান দরগাহপুরী (রহ.) বলেন-নদীয়ার কোন এক জলসায় লোকে লোকারণ্য, আমার পীর ও মুর্শিদ মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) ওয়ায করছেন, নীরবে নিস্তব্ধে সবাই শুনছেন। হঠাৎ দূরে দেখা গেল কতগুলো লোক দোকানে জটলা করছে। হুযুর বলেন-বাবা! ওখানে কিসের জটলা? কে একজন বলল, হুযুর! ওখানে বিড়ির দোকান। তিনি গর্জে উঠলেন, আবূ বকরের জলসায় বিড়ির দোকান! মকরুহ তাহরিমি হচ্ছে। তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই একদল লোক যেয়ে বিড়িওয়ালাকে মারধর করে দোকান নষ্ট করে ফেলে।
অতঃপর সুলতানুল ওয়ায়েযীন আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.) ইন্নাকা লা আলা খুলুকীন আযীম আয়াতে কারীমা তিলাওয়াত করে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ ও উন্নতমনা চরিত্রের নিপুণ ব্যাখ্যা তাঁর স্বভাবসিদ্ধভাবে করতে থাকেন। তাঁর চোখে পানি, শ্রোতারাও কেঁদে কেঁদে জারে জার। হঠাৎ লোকজনের ব্যস্ততার আওয়াজে তিনি চোখ খুলে দেখেন, মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) মিম্বরে পুনঃ তশরিফ এনেছেন। আল্লামা ওয়ায বন্ধ করে দিলেন, সমস্ত মজলিস নিস্তব্ধ। মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) বলেন ঃ বাবারা! আমার কথায় বিড়িওয়ালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনি কোথায়? বিড়িওয়ালা ভয়ে পায়খানা ঘরে লুকিয়ে গেছে। তাঁর আদেশে উক্ত বিড়িওয়ালাকে খুঁজে খেদমতে আনা হল। অতি সাধারণ মানুষ ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। হাজার হাজার হৃদযন্ত্রও দ্রুত ওঠানামা করছে। হুযুর বিড়িওয়ালার হাত ধরে বলেন: আপনার কত টাকার মাল ক্ষতি হয়েছে? সে ব্যক্তি কিছু বলা তো দূরের কথা, কেবল কাঁদছে। তিনি তাকে দশটি টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন: বাবা! আবূ বকরের কথায় আপনার ক্ষতি হয়েছে, লোকেরা লাঞ্ছিত করেছে। বাবা! আবূ বকরকে ক্ষমা করে দিন। হাজার হাজার শ্রোতা হুযুরের হুসনে আখলাক দেখে, হাহাকার করে কেঁদে জারে জার হচ্ছে। হুযুর বললেন: ক্ষতিপূরণের এই টাকা গ্রহণ করুন। বাবা! বিড়ির কারবার না করা ভাল।
বাদুড়িয়া (২৪ পরগনা জেলা) থানার রাজবেড়িয়া গ্রামের বড় বুজুর্গ মুনশী হামিজদ্দীন (রহ.) বর্ণনা করেছেন। ইটিন্ডা গ্রামের জনাব দিদার বকস্ নামে একজন ধনাঢ্য দীনদার নিঃসন্তান ব্যক্তি ছিলেন। সন্তানের কামনায় তিনি তিন বিবাহ করেন এবং নানারকম চিকিৎসার ত্রুটি করেন নি। নিঃসন্তান দিদার বকস্ মিয়া অবশেষে মোজাদ্দেদে-জামান (রহ.)-এর কাছে তদবীর করার ইচ্ছা করেন। নির্ধারিত দিনে, নিকটস্থ গ্রামে জলসার দাওয়াতের সুযোগে হুযুরকে রাযী করিয়ে সকালে নিয়ে আসেন। তদবীরের কাজ চলতে থাকে। দিদার বকস্ মিয়া নানারকম সুখাদ্য তৈরি করে যোহরের নামাজ অন্তে দস্তরখানে হুযূরের খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আশ্চর্য! তৈরি খাদ্যসামগ্রী হুযুরের সামনে নিয়ে দেখা যায়, তরকারী, মাছ, গোশ্ত সব কাঁচা। হুযুর বলেন-বাবা! আবূ বকরকে কি কাঁচা খাওয়াবে?’ লজ্জিত হয়ে উক্ত সামগ্রী ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত রান্নার ব্যবস্থা করে আনা হল। এবারও দেখা গেল, পূর্বের ন্যায় কাঁচা। তৃতীয়বার তাঁর বড় বিবি নিজের তত্ত্বাবধানে সংক্ষেপে রান্না করা সামগ্রী, আসর বাদ হুযূরের খেদমতে আনা হয়, এবার সবকিছু স্বাভাবিক থাকায় হুযুর খাদ্য গ্রহণ করলেন।
সাথীরা (খাদেমরা) হুযুরকে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করেন, হুযূর! যদি দিদার বকস্ মিয়ার মাল হারাম হয়, তবে তো তারই মাল তিনবার রান্না হল ঃ দুবার কাঁচা, একবার পাকা হওয়ার হেতু কি? হুযুর জবাবে বলেন বাবা! আবূ বকরকে আল্লাহ্ পাক দাইুয়ূসের হাতের রান্না খাওয়াবে না। স্থানীয় মুনশীরা বলেন-হুযুর তার তিন বিবি. প্রত্যেকে নামাজী দীনদার ও পর্দানশীন। হুযুর বললেন ঃ বাবা! তার বিবিরা দাইয়ূস (বেপর্দাবিহারিণী) নয়, কিন্তু ওনার (দিদার বকসের) বাড়িতে যে ঝি মেয়েটি সংসার ও রান্নার কাজে সহায়তা করে, সে দাইয়ূস। শেষবারের রান্নায় বড় বিবি ঝি মেয়েটির সহায়তা নেয়নি। তাই আল্লাহ্পাক আবূ বকরকে দুটো খাওয়ালেন।
মোজাহিদে মিল্লাত আল্লামা বজলুর রহমান দরগাহপুরী (রহ.) বলেছেন: এক সময় মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) বাদুড়িয়া বাজারে জলসায় আসেন। তাঁর বিশ্রামের সময় কে যেন হুযুরের কানে পৌছে দিয়েছে, হুযূর! যার বাড়ি খাবেন সে ব্যক্তি সুদখোর। হুযূর দাওয়াতকারী বাড়িওয়ালাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাড়িওয়ালা এবং তাঁর পিতা ও দাদা সুদখোর নন। শুনেছেন দাদার পিতা সুদ খেত। মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) বলেন আপনারা (আলেমরা) খান। আবূ বকর (তিনি নিজের নাম ধরে বলতেন) খাবে না; যেহেতু সন্দেহ আছে বলে। বর্ণনাকারী বলেন পোলাও কোরমা আমরা খেলাম আর হুজুর গরীব বুড়ির বাড়ির আলু-ভর্তা ভাত (খোরাকী দিয়ে) খেলেন।
 মোজাহিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি জুলফিকার আলী সিদ্দিকী (রহ.) বলেছেন: জীবনের অন্তিমকালে রোযার সময় হুযূরের শরীর অত্যন্ত দুর্বল, এমনকি উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। ডাক্তার ও সকলে হুযুরকে রোযা না থাকার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তিনি জীবনে আর রোযা করার সময় পাবেন কিনা, সে নিশ্চয়তা যখন নেই, তখন রোযা রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। হুযুরের অবস্থা দেখে, আমরা সঙ্কিত। কিন্তু হুযুর ঠিকই রোযা আদায় করছেন এবং নামাজের ওয়াক্তে ঠিক নামাজ পড়ছেন। কলকাতা ওয়াসেল মোল্লা ম্যানশনে একবার হুযুরের লাকুয়া হয়। আমি ও আম্মাজী (সেজ হুযূর জননী) তাঁকে ধরে শুইয়ে দেই। হুযুর কখনও সম্বিতহারা হচ্ছেন, সম্বিত হলেই ্নামাজের ওয়াক্তের খোঁজ নিচ্ছেন, যথাসময়ে ঐ অবস্থায় নামাজ আদায় করছেন। এক সময় এমন পর্যায় হল যে, কেবলা ঠিক চেনা এবং দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার তাকতহারা, কিন্তু তিনি বললেন-(ইশারায়) আমাকে নামাজে দাঁড় করিয়ে দাও। সে অবস্থায় নামাজ সমাধা করলেন। জীবনে নামাজ তাঁর কাযা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
(সংগৃহীত)

Comments

comments

Related Post